পহেলা আষাঢ়ে বর্ষার আনুষ্ঠানিক আগমনের সঙ্গে সঙ্গে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নবীনগরের প্রকৃতিতে ফুটে উঠেছে কদমফুল। সাদা-হলুদ গোলাকার এই ফুলের সৌরভ ও সৌন্দর্যে চারপাশে ছড়িয়ে পড়েছে বর্ষার স্নিগ্ধ আবহ। তবে প্রকৃতির এই চিরচেনা অনুষঙ্গ এখন আগের মতো চোখে পড়ে না। স্থানীয়দের মতে, দিন দিন কমে যাচ্ছে কদমগাছের সংখ্যা।
বাংলা ঋতুচক্রে আষাঢ় ও শ্রাবণ মাস বর্ষা ঋতুর সময়। একসময় বর্ষার আগমনী বার্তা নিয়ে গ্রামবাংলার পথে-প্রান্তরে দেখা মিলত অসংখ্য কদমফুলের। কিন্তু বর্তমানে নবীনগরের বিভিন্ন এলাকায় কদমগাছের উপস্থিতি অনেকটাই কমে গেছে। ফলে বর্ষার সঙ্গে জড়িয়ে থাকা এই ঐতিহ্যবাহী ফুল ধীরে ধীরে দুর্লভ হয়ে উঠছে।
স্থানীয়রা বলেন, কদমফুল না ফুটলে যেন বর্ষার পূর্ণতা আসে না। কাঠফাটা গরমের পর গুচ্ছ গুচ্ছ কদমফুলের উপস্থিতি প্রকৃতিকে নতুন প্রাণ দেয়। বৃষ্টির রিনিঝিনি শব্দ আর কদমফুলের সৌন্দর্য মিলে তৈরি করে বর্ষার স্বতন্ত্র আবহ।
বিশিষ্ট লেখক ও সাংবাদিক আবু কামাল খন্দকার বলেন, “কদম নামটি এসেছে সংস্কৃত ‘কদম্ব’ শব্দ থেকে। কদম্বের অর্থ, যা বিরহীকে দুঃখী করে। কদমফুলের আরও বেশ কয়েকটি নাম রয়েছে, যেমন—বৃত্তপুষ্প, সুরভী, মেঘাগমপ্রিয় ও কর্ণপূরক। প্রাচীন সাহিত্য, বৈষ্ণব পদাবলি এবং রাধা-কৃষ্ণের প্রেমকাহিনিতেও কদমফুলের উল্লেখ পাওয়া যায়।”
শিক্ষানুরাগী ও লেখক বাবু মুকুলেশ ঢালী বলেন, “কদমফুল শুধু সৌন্দর্যের প্রতীক নয়, এর রয়েছে নানা উপকারিতা। কদমগাছের ছাল জ্বরের ওষুধ তৈরিতে ব্যবহৃত হয়। এর কাঠ দিয়াশলাই তৈরিতেও কাজে লাগে। তাই প্রকৃতি ও ঐতিহ্য রক্ষায় কদমগাছ সংরক্ষণ জরুরি।”
নবীনগর উপজেলা কৃষিবিদ জাহাঙ্গীর আলম লিটন বলেন, “মানুষ এখন প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের চেয়ে বাণিজ্যিকভাবে লাভজনক গাছের দিকে বেশি ঝুঁকছে। কদমগাছের পরিবর্তে মেহগনি, রেইনট্রি ও অন্যান্য মূল্যবান কাঠের গাছ লাগানো হচ্ছে। ফলে দেশীয় গাছপালা ও ফুল ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে।”
তিনি আরও বলেন, পরিবেশের ভারসাম্য ও বাঙালি সংস্কৃতির ঐতিহ্য রক্ষায় সরকারি উদ্যোগের পাশাপাশি সামাজিক সচেতনতা বাড়ানো প্রয়োজন। অন্য গাছের পাশাপাশি কদমগাছ রোপণে উৎসাহিত করতে পারলে ভবিষ্যৎ প্রজন্মও বর্ষার এই চিরচেনা সৌন্দর্যের সঙ্গে পরিচিত হতে পারবে।
বর্ষার প্রথম দিনে নবীনগরের বিভিন্ন এলাকায় ফুটে থাকা কদমফুল যেন আবারও মনে করিয়ে দিল—প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক কতটা গভীর। তবে সেই সৌন্দর্য টিকিয়ে রাখতে এখনই প্রয়োজন কদমগাছ সংরক্ষণ ও ব্যাপকভাবে রোপণের উদ্যোগ।
ফরিদ আহমেদ, ব্রাহ্মণবাড়িয়া প্রতিনিধি 



















