মাহমুদুর রহমান মনজু
লক্ষ্মীপুর প্রতিনিধি
গ্রামবাংলার অতি পরিচিত এক দৃশ্য—বর্ষার রাতে উঠানে বা ভেজা ঘাসের ওপর কই মাছের লাফালাফি। লোকমুখে প্রচলিত, “আজ কই ওঠার বৃষ্টি নেমেছে।” অনেকের কাছে এটি নিছক লোককথা মনে হলেও বাস্তবে এর পেছনে রয়েছে মৎস্যজীবীদের দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা ও প্রকৃতির ইঙ্গিত। তবে সব ধরনের বৃষ্টিতে কই মাছ ডাঙায় ওঠে না; এর জন্য প্রয়োজন নির্দিষ্ট কিছু প্রাকৃতিক পরিবেশ।
সাধারণত অন্য মাছ ডাঙায় উঠলে অক্সিজেনের অভাবে দ্রুত মারা যায়। কিন্তু কই মাছ দীর্ঘ সময় বেঁচে থাকতে পারে। এর মূল কারণ তাদের শরীরে থাকা ‘ল্যাবিরিন্থ অর্গান’ নামের বিশেষ অঙ্গ, যা বাতাস থেকে সরাসরি অক্সিজেন গ্রহণ করতে সক্ষম। এই বৈশিষ্ট্যের কারণেই কই মাছ জলাশয় ছেড়ে ডাঙায় চলাচল করতে পারে এবং অন্য মাছের তুলনায় অনেক বেশি সহনশীল হয়ে ওঠে।
মৎস্য অধিদপ্তরের তথ্যমতে, কই মাছের ডাঙায় ওঠার প্রবণতা মূলত তাদের বেঁচে থাকা ও বংশবিস্তার কৌশলের অংশ। টানা ভারী বর্ষণে পুকুর, ডোবা ও খাল উপচে একাকার হয়ে গেলে জলাশয়গুলোর মধ্যে সংযোগ তৈরি হয়। তখন কই মাছ নতুন বাসস্থান ও খাদ্যের সন্ধানে বেরিয়ে পড়ে। একই সঙ্গে প্রজননের জন্যও তারা নতুন পরিবেশ খুঁজে নেয়।
যখন চারপাশ প্লাবিত হয়ে অগভীর পানির স্তর তৈরি হয়, তখন সেই পরিবেশ কই মাছের জন্য সবচেয়ে অনুকূল হয়ে ওঠে। কাদা ও ভেজা ঘাসের ওপর পাখনার সাহায্যে শরীর ঠেলে তারা অনেকটা হামাগুড়ি দিয়ে এগোয়। এই সময় শরীর শুকিয়ে যাওয়ার ঝুঁকি কম থাকায় তাদের চলাচল সহজ হয়।
সদর উপজেলার পার্বতীনগর ইউনিয়নের মৎস্যজীবী নরেশ জানান, ঝুম বৃষ্টির পর যখন আবহাওয়া শান্ত হয় এবং রাত বাড়ে, তখনও কই মাছ ডাঙায় ওঠে। বৃষ্টির পর ভেজা মাটি, ঠান্ডা পরিবেশ ও বাতাসের আর্দ্রতা কই মাছের চলাচলের জন্য নিরাপদ পরিস্থিতি তৈরি করে। রোদের তাপ না থাকায় শরীর শুকিয়ে যাওয়ার ভয়ও থাকে না।
লক্ষ্মীপুর পৌরসভার ১২ নম্বর ওয়ার্ডের মৎস্য শিকারি আকবর বলেন, সব সময় কই মাছ ডাঙায় ওঠে না। অনেক সময় জলাশয়ে অক্সিজেনের মাত্রা কমে গেলে বা পানি দূষিত হলে কই মাছ বিকল্প আশ্রয়ের খোঁজে ডাঙায় উঠে আসে। এ ক্ষেত্রে বৃষ্টি তাদের জন্য পালানোর সুযোগ তৈরি করে।
অন্যদিকে সদর উপজেলার দক্ষিণ হামসাদী ইউনিয়নের জেলে মোকলেস জানান, হালকা ঝিরঝিরে বৃষ্টি বা অল্প সময়ের একপশলা বৃষ্টিতে সাধারণত কই মাছ ওঠে না। কারণ এতে জলাশয়গুলোর মধ্যে সংযোগ তৈরি হয় না এবং মাটিও যথেষ্ট ভেজে না। বড় ধরনের পরিবেশগত পরিবর্তন না হলে কই মাছ নিরাপদ আশ্রয় ছেড়ে বের হয় না।
লক্ষ্মীপুর সদর উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা বলেন, অনেক প্রাণী বায়ুচাপ ও আর্দ্রতার পরিবর্তন আগে থেকেই অনুভব করতে পারে। কই মাছও এমন সূক্ষ্ম পরিবেশগত সংকেত বুঝতে সক্ষম। এ কারণেই বৃষ্টির আগেই গ্রামীণ মানুষ কই মাছ ধরার প্রস্তুতি নিতে শুরু করে।
শতাব্দী প্রাচীন এই লোককথার আড়ালে লুকিয়ে আছে কই মাছের অভিযোজন এবং টিকে থাকার এক অনন্য গল্প।
০৯:৫৬ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ২২ জুলাই ২০২৬, ৭ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
শিরোনাম :
বর্ষার রাতে ডাঙায় কই মাছ—লোককথার আড়ালে টিকে থাকার গল্প
-
Reporter Name - আপডেট টাইম : ০১:১৫:৫৩ অপরাহ্ন, বুধবার, ৬ মে ২০২৬
- ১২৭ বার
জনপ্রিয় সংবাদ




















