বাংলার হাজার বছরের লোকজ সংস্কৃতির অন্যতম অনুষঙ্গ পুতুল নাচ আজ বিলুপ্তির পথে। একসময় গ্রামবাংলার আবাল-বৃদ্ধ-বণিতার বিনোদনের প্রধান মাধ্যম ছিল এ শিল্প। বিশেষ করে শিশুদের আনন্দ-বিনোদনে পুতুল নাচের ছিল আলাদা আবেদন। অথচ আধুনিক বিনোদনের দাপট, পৃষ্ঠপোষকতার অভাব এবং অশ্লীল নাচ-গানের আগ্রাসনে হারিয়ে যেতে বসেছে নবীনগরের ঐতিহ্যবাহী পুতুল নাচ।
ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নবীনগর উপজেলার প্রাচীন জনপদ কৃষ্ণনগর গ্রামেই জন্ম নিয়েছিলেন ভারতীয় উপমহাদেশের আধুনিক পুতুল নাচের জনক ওস্তাদ বিপিন দাস। ১৮৭৯ সালের ৩১ ডিসেম্বর বৃন্দাবন দাসের ঘরে জন্ম নেওয়া এই কালজয়ী শিল্পী শৈশব থেকেই শিল্প-সংস্কৃতির প্রতি আকৃষ্ট ছিলেন। কৈশোরে মাটির পুতুল দেখে তাঁর মনে স্বপ্ন জাগে—পুতুলকে নাচিয়ে মানুষের আনন্দ ও সচেতনতার মাধ্যম তৈরি করার।
সেই ভাবনা থেকেই তিনি তৈরি করেন মাটির, স্টিক, স্প্রিং ও সূতোর পুতুল। পৌরাণিক কাহিনি, গ্রামীণ জীবন, সুখ-দুঃখ, হাসি-কান্না ও সামাজিক নানা বাস্তবতা স্থান পায় তাঁর পুতুল নাচে। কখনও কাঠুরিয়ার ওপর বাঘের আক্রমণ, কখনও জেলেদের করুণ পরিণতি—সবই জীবন্ত হয়ে উঠত পুতুলের অভিনয়ে।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, বিপিন দাস তাঁর পরিবার ও শিষ্যদের নিয়ে গড়ে তোলেন একাধিক পুতুল নাচের দল। তাঁর শিষ্যরা পরবর্তীতে দেশের বিভিন্ন এলাকায় দল গঠন করে এ শিল্প ছড়িয়ে দেন। ব্রাহ্মণবাড়িয়া ছাড়াও বৃহত্তর কুমিল্লা, ময়মনসিংহ, নরসিংদী, বিক্রমপুর, সিলেট, নোয়াখালী ও অষ্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে পুতুল নাচ ব্যাপক জনপ্রিয়তা লাভ করে।
বিপিন দাসের দুই ছেলে ওস্তাদ গোপাল দাস ও গোবিন্দ দাসও পিতার পথ অনুসরণ করেন। গোপাল দাস ভারতে গিয়ে অসংখ্য শিষ্য তৈরি করেন এবং পুরো ভারতবর্ষে পুতুল নাচের পরিচিতি বাড়ান। জানা যায়, তিনি পুতুল নাচের দল নিয়ে বিশ্বের প্রায় ২৭টি দেশ সফর করেন।
শুধু পুতুল নাচই নয়, বিপিন দাস ছিলেন বহু গুণের অধিকারী। তিনি সেতার, হারমোনিয়াম, তবলা, রৌদ্রবীণা ও খৈমন বীণাসহ বিভিন্ন বাদ্যযন্ত্র বাজাতে পারতেন। ব্রিটিশ আমলে তিনি কয়েকটি নির্বাক চলচ্চিত্রও নির্মাণ করেছিলেন।
একসময় ‘মনহারা’, ‘রাজকন্যা মনিকমালা’, ‘রূপবান’, ‘গরিবের ছেলে’, ‘গাজী কালু’, ‘শুনাই সুন্দরী’সহ নানা পালা নিয়ে জমজমাট আয়োজন হতো। পুতুল নাচের দলে থাকত ১৪ জন সদস্য। গানের তালে তালে পুতুল পরিচালনা ও বাদ্যযন্ত্রের সমন্বয়ে দর্শকদের মুগ্ধ করতেন শিল্পীরা।
বর্তমানে পরিস্থিতি ভিন্ন। পুতুল নাচের সঙ্গে অশ্লীল নাচ-গানের অপসংস্কৃতি জড়িয়ে পড়ায় প্রশাসন অনেক সময় এ ধরনের অনুষ্ঠানের অনুমতি দিতে অনাগ্রহ দেখায়। এতে প্রকৃত শিল্পীরা পড়েছেন সংকটে।
পুতুল নাচ দলের সদস্যরা জানান, সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা ও প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হলে এ শিল্প আবারও ঘুরে দাঁড়াতে পারে। তারা বিপিন দাসের স্মৃতি সংরক্ষণ, গবেষণা কেন্দ্র স্থাপন এবং পুতুল নাচকে লোকজ সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য হিসেবে সংরক্ষণের দাবি জানান।
ফরিদ আহমেদ, ব্রাহ্মণবাড়িয়া প্রতিনিধি 



















