১০:০৩ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ২২ জুলাই ২০২৬, ৭ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

শেরপুরে গারো পাহাড়বাসী হাতির দাপটে আতঙ্কে

শেরপুরের গারো পাহাড়সংলগ্ন সীমান্তবর্তী তিন উপজেলার বিস্তীর্ণ এলাকায় এখন দিগন্তজোড়া সবুজের মুগ্ধতা। চোখ যত দূর যায়, তত দূর ধানের খেত—কোথাও গাঢ় সবুজ, কোথাও হালকা সবুজ, আবার কোথাও সোনালি আভা। যেন পাহাড়ের ঢালে প্রকৃতি নিজেই এঁকেছে নকশিকাঁথার মতো ফসলি জমির এক অপূর্ব দৃশ্য। তবে ভালো ফলনের আশায় থাকা কৃষকদের মনে আনন্দের পাশাপাশি রয়েছে বন্য হাতির আক্রমণের শঙ্কা।

সীমান্ত সড়ক ধরে শ্রীবরদী, ঝিনাইগাতী ও নালিতাবাড়ী উপজেলার বিভিন্ন পাহাড়সংলগ্ন এলাকা ঘুরে দেখা যায়—কণঝুড়া, হালচাটি, ঝুলগাঁও, বালিজুরি, বাবলাকুনা, খাড়ামুরা, বড়গজনী, তাওয়াকুচা, রাংটিয়া, গোমড়া, সমশ্চুড়া, পোড়াবাড়ি, বারোমারি, দাওধারা-কাটাবাড়ি, তারানি ও পানিহাটাসহ নানা এলাকায় ধানের সমারোহ।

তবে এই প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের মাঝেও সীমান্তবর্তী জনপদে বিরাজ করছে বন্য হাতির আতঙ্ক। স্থানীয়দের ভাষ্য, ধান পাকার মৌসুম এলেই ভারত সীমান্তবর্তী গারো পাহাড় থেকে হাতির দল লোকালয়ে নেমে আসে। তখন রাতভর আতঙ্কে থাকতে হয় তাদের।

বন বিভাগের গজনী বিট কর্মকর্তা সালেহীন নেওয়াজ বলেন, পাঁচ-ছয় দিন ধরে একটি হাতির দল তাওয়াকুচা-গজনী এলাকায় অবস্থান করছে। সন্ধ্যার পর এরা লোকালয়ে নেমে আসে। হাতিগুলোকে বনে ফেরাতে গ্রামবাসী, এলিফ্যান্ট রেসপন্স টিম ও বন বিভাগের সদস্যরা কাজ করছেন।

বালিজুরি রেঞ্জ কর্মকর্তা সুমন মিয়া বলেন, “সারা বছর শতাধিক হাতি তিন-চারটি দলে বিভক্ত হয়ে গারো পাহাড়ে খাদ্যের সন্ধানে ঘোরে। তবে ধান ও কাঁঠাল পাকার সময় তারা লোকালয়ে নেমে আসে এবং ফসলে হানা দেয়।

তিনি জানান, ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের ক্ষতিপূরণ দেওয়া হয় এবং হাতির ক্ষতি যাতে কেউ না করেন, সে বিষয়ে সতর্কতা অবলম্বন করা হচ্ছে।

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, শেরপুরের নালিতাবাড়ী, ঝিনাইগাতী ও শ্রীবরদী উপজেলার অন্তত ৩০টির বেশি গ্রামের মানুষ এখন বন্য হাতির আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন। প্রতিরাতেই কোনো না কোনো গ্রামে হাতির দল তাণ্ডব চালিয়ে ধানক্ষেত, মাল্টার বাগান ও বসতভিটা নষ্ট করছে। অনেক পরিবার রাত জেগে মশাল, টিন পেটানো ও শব্দ করে হাতির দল তাড়ানোর চেষ্টা করছেন।

স্থানীয়দের অভিযোগ, গারো পাহাড়ে হাতির আবাসস্থল ও খাদ্যের সংকট বেড়ে যাওয়ায় মানুষ-হাতির দ্বন্দ্বও বাড়ছে। বিশেষ করে ভারতের মেঘালয় সীমান্ত থেকে নেমে আসা হাতির দল খাবারের সন্ধানে লোকালয়ে ঢুকে পড়ছে।

জানা গেছে, গত ৯ বছরে (২০১৪-২০২৩) শেরপুরের গারো পাহাড় এলাকায় হাতির আক্রমণে অন্তত ৩৮ জন মানুষের মৃত্যু হয়েছে। একই সঙ্গে বিভিন্ন সময়ে বিদ্যুতায়িত ফাঁদে ও সংঘর্ষে কয়েকটি হাতিরও মৃত্যু হয়েছে। বন বিভাগ বলছে, হাতি হত্যা বন্ধে সচেতনতা বাড়ানোর পাশাপাশি অভয়াশ্রম ও খাদ্যসংকট নিরসনে উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন।

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. সাখাওয়াত হোসেন বলেন, “সীমান্তবর্তী এলাকায় ধানের ফলন ভালো হয়েছে। পাহাড়ি অঞ্চলে সেচের কারণে চাষ কিছুটা দেরিতে হয়। ধান কাটতে আরও কিছু সময় লাগবে। তবে ধান পাকলেই হাতির কারণে কৃষকদের দুশ্চিন্তা বাড়ে।

স্থানীয় কৃষকদের দাবি, বন্য হাতির আক্রমণ থেকে ফসল ও জানমাল রক্ষায় কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার পাশাপাশি গারো পাহাড়ে হাতির জন্য নিরাপদ আবাসস্থল গড়ে তোলা জরুরি। তবেই মানুষ ও বন্য প্রাণীর সহাবস্থান নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।

জনপ্রিয় সংবাদ

পুরুষ নির্যাতন প্রতিরোধে আইন প্রণয়নের নির্দেশনা চেয়ে হাইকোর্টে রিট

শেরপুরে গারো পাহাড়বাসী হাতির দাপটে আতঙ্কে

আপডেট টাইম : ০৩:৫৮:২৪ অপরাহ্ন, রবিবার, ১০ মে ২০২৬

শেরপুরের গারো পাহাড়সংলগ্ন সীমান্তবর্তী তিন উপজেলার বিস্তীর্ণ এলাকায় এখন দিগন্তজোড়া সবুজের মুগ্ধতা। চোখ যত দূর যায়, তত দূর ধানের খেত—কোথাও গাঢ় সবুজ, কোথাও হালকা সবুজ, আবার কোথাও সোনালি আভা। যেন পাহাড়ের ঢালে প্রকৃতি নিজেই এঁকেছে নকশিকাঁথার মতো ফসলি জমির এক অপূর্ব দৃশ্য। তবে ভালো ফলনের আশায় থাকা কৃষকদের মনে আনন্দের পাশাপাশি রয়েছে বন্য হাতির আক্রমণের শঙ্কা।

সীমান্ত সড়ক ধরে শ্রীবরদী, ঝিনাইগাতী ও নালিতাবাড়ী উপজেলার বিভিন্ন পাহাড়সংলগ্ন এলাকা ঘুরে দেখা যায়—কণঝুড়া, হালচাটি, ঝুলগাঁও, বালিজুরি, বাবলাকুনা, খাড়ামুরা, বড়গজনী, তাওয়াকুচা, রাংটিয়া, গোমড়া, সমশ্চুড়া, পোড়াবাড়ি, বারোমারি, দাওধারা-কাটাবাড়ি, তারানি ও পানিহাটাসহ নানা এলাকায় ধানের সমারোহ।

তবে এই প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের মাঝেও সীমান্তবর্তী জনপদে বিরাজ করছে বন্য হাতির আতঙ্ক। স্থানীয়দের ভাষ্য, ধান পাকার মৌসুম এলেই ভারত সীমান্তবর্তী গারো পাহাড় থেকে হাতির দল লোকালয়ে নেমে আসে। তখন রাতভর আতঙ্কে থাকতে হয় তাদের।

বন বিভাগের গজনী বিট কর্মকর্তা সালেহীন নেওয়াজ বলেন, পাঁচ-ছয় দিন ধরে একটি হাতির দল তাওয়াকুচা-গজনী এলাকায় অবস্থান করছে। সন্ধ্যার পর এরা লোকালয়ে নেমে আসে। হাতিগুলোকে বনে ফেরাতে গ্রামবাসী, এলিফ্যান্ট রেসপন্স টিম ও বন বিভাগের সদস্যরা কাজ করছেন।

বালিজুরি রেঞ্জ কর্মকর্তা সুমন মিয়া বলেন, “সারা বছর শতাধিক হাতি তিন-চারটি দলে বিভক্ত হয়ে গারো পাহাড়ে খাদ্যের সন্ধানে ঘোরে। তবে ধান ও কাঁঠাল পাকার সময় তারা লোকালয়ে নেমে আসে এবং ফসলে হানা দেয়।

তিনি জানান, ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের ক্ষতিপূরণ দেওয়া হয় এবং হাতির ক্ষতি যাতে কেউ না করেন, সে বিষয়ে সতর্কতা অবলম্বন করা হচ্ছে।

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, শেরপুরের নালিতাবাড়ী, ঝিনাইগাতী ও শ্রীবরদী উপজেলার অন্তত ৩০টির বেশি গ্রামের মানুষ এখন বন্য হাতির আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন। প্রতিরাতেই কোনো না কোনো গ্রামে হাতির দল তাণ্ডব চালিয়ে ধানক্ষেত, মাল্টার বাগান ও বসতভিটা নষ্ট করছে। অনেক পরিবার রাত জেগে মশাল, টিন পেটানো ও শব্দ করে হাতির দল তাড়ানোর চেষ্টা করছেন।

স্থানীয়দের অভিযোগ, গারো পাহাড়ে হাতির আবাসস্থল ও খাদ্যের সংকট বেড়ে যাওয়ায় মানুষ-হাতির দ্বন্দ্বও বাড়ছে। বিশেষ করে ভারতের মেঘালয় সীমান্ত থেকে নেমে আসা হাতির দল খাবারের সন্ধানে লোকালয়ে ঢুকে পড়ছে।

জানা গেছে, গত ৯ বছরে (২০১৪-২০২৩) শেরপুরের গারো পাহাড় এলাকায় হাতির আক্রমণে অন্তত ৩৮ জন মানুষের মৃত্যু হয়েছে। একই সঙ্গে বিভিন্ন সময়ে বিদ্যুতায়িত ফাঁদে ও সংঘর্ষে কয়েকটি হাতিরও মৃত্যু হয়েছে। বন বিভাগ বলছে, হাতি হত্যা বন্ধে সচেতনতা বাড়ানোর পাশাপাশি অভয়াশ্রম ও খাদ্যসংকট নিরসনে উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন।

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. সাখাওয়াত হোসেন বলেন, “সীমান্তবর্তী এলাকায় ধানের ফলন ভালো হয়েছে। পাহাড়ি অঞ্চলে সেচের কারণে চাষ কিছুটা দেরিতে হয়। ধান কাটতে আরও কিছু সময় লাগবে। তবে ধান পাকলেই হাতির কারণে কৃষকদের দুশ্চিন্তা বাড়ে।

স্থানীয় কৃষকদের দাবি, বন্য হাতির আক্রমণ থেকে ফসল ও জানমাল রক্ষায় কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার পাশাপাশি গারো পাহাড়ে হাতির জন্য নিরাপদ আবাসস্থল গড়ে তোলা জরুরি। তবেই মানুষ ও বন্য প্রাণীর সহাবস্থান নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।