০৭:৫৭ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ২২ জুলাই ২০২৬, ৭ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

তালগাছ কমছে, বজ্রপাত বাড়ছে; তবু তালের শাঁসে স্বপ্ন বুনছেন আবুল

গ্রামবাংলার ঐতিহ্যবাহী মৌসুমি ফল তাল এখন আর আগের মতো সহজে চোখে পড়ে না। একদিকে বাড়ছে বজ্রপাত, অন্যদিকে দিন দিন কমে যাচ্ছে তালগাছ। ফলে নবীনগরে বেড়েছে তালের শাঁসের চাহিদা ও দাম। এ অবস্থায় তালের শাঁস বিক্রি করে স্বাবলম্বী হওয়ার স্বপ্ন দেখছেন উপজেলার মাঝিকাড়া গ্রামের আবুল মিয়া।

নবীনগর-কোম্পানীগঞ্জ মোড়, উপজেলা গেইট, সরকারি কলেজ গেইট, সরস্বতী হাইস্কুল সংলগ্ন এলাকা ও বাজারের বিভিন্ন মোড়ে প্রতিদিন কাঁচা তাল নিয়ে বসছেন ব্যবসায়ীরা। বর্তমানে প্রতি পিস তালের শাঁস বিক্রি হচ্ছে ৩০ থেকে ৪০ টাকায়। এক কুড়ি কাঁচা তাল বিক্রি হচ্ছে ৩০০ থেকে ৪০০ টাকায়। অথচ কিছুদিন আগেও এক বুড়ি পাকা তাল বিক্রি হতো ২০০ টাকায়।
উপজেলা কৃষি বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, উপজেলার ২১টি ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভায় প্রায় ৭ হাজার ৬০০টি তালগাছ রয়েছে। এর মধ্যে শ্যামগ্রাম, আগরাবাদ, মইনপুর, সাতমোড়া, ফতেহপুর, বিটঘর, শিবপুর, বড়িকান্দি ও সলিমগঞ্জ ইউনিয়নে তুলনামূলক বেশি তালগাছ রয়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দা আব্দুল মুহিন বলেন, “আগের মতো এখন আর তাল পাওয়া যায় না। আগে গ্রামের পাশে অনেক তালগাছ ছিল, এখন সেগুলো চোখে পড়ে না। কয়েক বছর পর হয়তো কাঁচা তালের শাঁসও আর খেতে পারব না।”
তিনি আরও বলেন, আগে ৭০ থেকে ৯০ টাকায় চারটি তাল কেনা যেত, এখন ২৫০ টাকাতেও পাওয়া কঠিন হয়ে গেছে।
স্থানীয় শিক্ষক আসাদুজ্জামান সোহেল বলেন, “তাল শুধু সুস্বাদু ফল নয়, এটি গ্রামীণ ঐতিহ্যেরও অংশ। তালগাছ কমে যাওয়ায় দাম বাড়ছে। ঐতিহ্য রক্ষা ও পরিবেশের ভারসাম্য বজায় রাখতে সবাইকে বেশি বেশি তালগাছ লাগাতে হবে।”
পৌরসভার মাঝিপাড়া গ্রামের আবুল মিয়া বর্তমানে উপজেলা স্কুল গেইটের পাশে প্রতিদিন তালের শাঁস বিক্রি করছেন। তিনি জানান, “আমি প্রায় পাঁচ বছর ধরে এই ব্যবসা করছি। গত দুই বছর নানা সমস্যার কারণে ব্যবসা করতে পারিনি। এবার আবার শুরু করেছি। এখন তালের দাম অনেক বেশি, বাজারে তালও কম পাওয়া যাচ্ছে। তবে এই ব্যবসা করে স্বাবলম্বী হওয়ার চেষ্টা করছি।”
শ্যামগ্রাম ইউনিয়নের ব্যবসায়ী আদম মিয়া বলেন, “আগে এক আঁটি তাল ১৮০ টাকায় কিনেছি। এখন সেটি ৭০০ থেকে ৮০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। এক বুড়ি তালের শাঁস ৩০০ থেকে ৩৫০ টাকা। প্রতিদিন কয়েক হাজার টাকার তাল কিনে বিক্রি করছি।”
নবীনগর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা জাহাঙ্গীর আলম বলেন, “তালের শাঁস যেমন সুস্বাদু, তেমনি পুষ্টিকর। তালের রস দিয়ে গুড় ও বিভিন্ন খাদ্যপণ্য তৈরি হয়। কিন্তু জলবায়ু পরিবর্তন ও পরিবেশগত কারণে তালগাছ দিন দিন কমে যাচ্ছে।”
তিনি জানান, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে বজ্রপাত সহনশীল গাছ হিসেবে তালগাছের চারা রোপণের কার্যক্রম নেওয়া হয়েছে। এছাড়া কৃষি বিভাগও মানুষকে বেশি বেশি তালগাছ লাগাতে উদ্বুদ্ধ করছে।
কৃষি বিভাগের মতে, গ্রামাঞ্চলে মানুষ তালগাছের গুরুত্ব না বুঝে নির্বিচারে গাছ কেটে ফেলছে। বছরে মাত্র একবার ফলন হওয়া এবং আর্থিক লাভ কম হওয়ায় অনেকেই তালগাছ সংরক্ষণে আগ্রহ হারাচ্ছেন।
তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, তালগাছ শুধু ফলের জন্য নয়, বজ্রপাতের ঝুঁকি কমাতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তাই পরিবেশ রক্ষা ও মানুষের নিরাপত্তার জন্য তালগাছ সংরক্ষণ এখন সময়ের দাবি।

জনপ্রিয় সংবাদ

পুরুষ নির্যাতন প্রতিরোধে আইন প্রণয়নের নির্দেশনা চেয়ে হাইকোর্টে রিট

তালগাছ কমছে, বজ্রপাত বাড়ছে; তবু তালের শাঁসে স্বপ্ন বুনছেন আবুল

আপডেট টাইম : ০৯:৪১:০৩ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৯ মে ২০২৬

গ্রামবাংলার ঐতিহ্যবাহী মৌসুমি ফল তাল এখন আর আগের মতো সহজে চোখে পড়ে না। একদিকে বাড়ছে বজ্রপাত, অন্যদিকে দিন দিন কমে যাচ্ছে তালগাছ। ফলে নবীনগরে বেড়েছে তালের শাঁসের চাহিদা ও দাম। এ অবস্থায় তালের শাঁস বিক্রি করে স্বাবলম্বী হওয়ার স্বপ্ন দেখছেন উপজেলার মাঝিকাড়া গ্রামের আবুল মিয়া।

নবীনগর-কোম্পানীগঞ্জ মোড়, উপজেলা গেইট, সরকারি কলেজ গেইট, সরস্বতী হাইস্কুল সংলগ্ন এলাকা ও বাজারের বিভিন্ন মোড়ে প্রতিদিন কাঁচা তাল নিয়ে বসছেন ব্যবসায়ীরা। বর্তমানে প্রতি পিস তালের শাঁস বিক্রি হচ্ছে ৩০ থেকে ৪০ টাকায়। এক কুড়ি কাঁচা তাল বিক্রি হচ্ছে ৩০০ থেকে ৪০০ টাকায়। অথচ কিছুদিন আগেও এক বুড়ি পাকা তাল বিক্রি হতো ২০০ টাকায়।
উপজেলা কৃষি বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, উপজেলার ২১টি ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভায় প্রায় ৭ হাজার ৬০০টি তালগাছ রয়েছে। এর মধ্যে শ্যামগ্রাম, আগরাবাদ, মইনপুর, সাতমোড়া, ফতেহপুর, বিটঘর, শিবপুর, বড়িকান্দি ও সলিমগঞ্জ ইউনিয়নে তুলনামূলক বেশি তালগাছ রয়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দা আব্দুল মুহিন বলেন, “আগের মতো এখন আর তাল পাওয়া যায় না। আগে গ্রামের পাশে অনেক তালগাছ ছিল, এখন সেগুলো চোখে পড়ে না। কয়েক বছর পর হয়তো কাঁচা তালের শাঁসও আর খেতে পারব না।”
তিনি আরও বলেন, আগে ৭০ থেকে ৯০ টাকায় চারটি তাল কেনা যেত, এখন ২৫০ টাকাতেও পাওয়া কঠিন হয়ে গেছে।
স্থানীয় শিক্ষক আসাদুজ্জামান সোহেল বলেন, “তাল শুধু সুস্বাদু ফল নয়, এটি গ্রামীণ ঐতিহ্যেরও অংশ। তালগাছ কমে যাওয়ায় দাম বাড়ছে। ঐতিহ্য রক্ষা ও পরিবেশের ভারসাম্য বজায় রাখতে সবাইকে বেশি বেশি তালগাছ লাগাতে হবে।”
পৌরসভার মাঝিপাড়া গ্রামের আবুল মিয়া বর্তমানে উপজেলা স্কুল গেইটের পাশে প্রতিদিন তালের শাঁস বিক্রি করছেন। তিনি জানান, “আমি প্রায় পাঁচ বছর ধরে এই ব্যবসা করছি। গত দুই বছর নানা সমস্যার কারণে ব্যবসা করতে পারিনি। এবার আবার শুরু করেছি। এখন তালের দাম অনেক বেশি, বাজারে তালও কম পাওয়া যাচ্ছে। তবে এই ব্যবসা করে স্বাবলম্বী হওয়ার চেষ্টা করছি।”
শ্যামগ্রাম ইউনিয়নের ব্যবসায়ী আদম মিয়া বলেন, “আগে এক আঁটি তাল ১৮০ টাকায় কিনেছি। এখন সেটি ৭০০ থেকে ৮০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। এক বুড়ি তালের শাঁস ৩০০ থেকে ৩৫০ টাকা। প্রতিদিন কয়েক হাজার টাকার তাল কিনে বিক্রি করছি।”
নবীনগর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা জাহাঙ্গীর আলম বলেন, “তালের শাঁস যেমন সুস্বাদু, তেমনি পুষ্টিকর। তালের রস দিয়ে গুড় ও বিভিন্ন খাদ্যপণ্য তৈরি হয়। কিন্তু জলবায়ু পরিবর্তন ও পরিবেশগত কারণে তালগাছ দিন দিন কমে যাচ্ছে।”
তিনি জানান, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে বজ্রপাত সহনশীল গাছ হিসেবে তালগাছের চারা রোপণের কার্যক্রম নেওয়া হয়েছে। এছাড়া কৃষি বিভাগও মানুষকে বেশি বেশি তালগাছ লাগাতে উদ্বুদ্ধ করছে।
কৃষি বিভাগের মতে, গ্রামাঞ্চলে মানুষ তালগাছের গুরুত্ব না বুঝে নির্বিচারে গাছ কেটে ফেলছে। বছরে মাত্র একবার ফলন হওয়া এবং আর্থিক লাভ কম হওয়ায় অনেকেই তালগাছ সংরক্ষণে আগ্রহ হারাচ্ছেন।
তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, তালগাছ শুধু ফলের জন্য নয়, বজ্রপাতের ঝুঁকি কমাতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তাই পরিবেশ রক্ষা ও মানুষের নিরাপত্তার জন্য তালগাছ সংরক্ষণ এখন সময়ের দাবি।