০৯:৪২ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ২২ জুলাই ২০২৬, ৭ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

হলুদে মোড়া লক্ষ্মীপুরের মাঠ, সরিষার বাম্পার ফলনে বদলাচ্ছে গ্রামীণ অর্থনীতি।

  • Reporter Name
  • আপডেট টাইম : ০৫:৪৩:২৫ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ১৭ জানুয়ারী ২০২৬
  • ১১১ বার

মাহমুদুর রহমান মনজু, লক্ষ্মীপুর প্রতিনিধি:
দিগন্তজোড়া মাঠজুড়ে সরিষার হলুদ ফুলে রঙিন হয়ে উঠেছে লক্ষ্মীপুরের কৃষি প্রান্তর। সরিষার বাম্পার ফলন এবার কৃষকের স্বপ্নকে আরও দৃঢ় করেছে, একই সঙ্গে গ্রামীণ অর্থনীতিতে জেগে উঠেছে সম্ভাবনার হাতছানি। চলতি মৌসুমে লক্ষ্মীপুর জেলার রায়পুর উপজেলায় প্রায় ১০ দশমিক ৩০ টন সরিষা উৎপাদনের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় বিস্তীর্ণ মাঠে এখন হলুদের ঢেউ।
সরেজমিনে দেখা যায়, রায়পুরসহ সদর, রামগঞ্জ, রামগতি ও কমলনগর উপজেলার মাঠগুলো সরিষা ফুলের হলুদ আভায় অপরূপ সৌন্দর্য ধারণ করেছে। ধূ-ধূ চর থেকে উঁচু জমি—সবখানেই যেন কেউ হলুদ চাদর বিছিয়ে রেখেছে। গাঢ় হলুদ ফুলে মৌমাছির গুনগুন শব্দ, শীতের শিশিরে ভেজা সরিষা ফুলের ঘ্রাণ বাতাসে ভেসে বেড়াচ্ছে, যা পথচারী ও দর্শনার্থীদের মন ছুঁয়ে যাচ্ছে।
লক্ষ্মীপুরে বিশেষ করে রায়পুর ও রামগতি এলাকায় সরিষা চাষে এবার বাম্পার ফলন হয়েছে। অনুকূল আবহাওয়া, কৃষি বিভাগের সহায়তা (উন্নত বীজ ও সার) এবং তুলনামূলক কম উৎপাদন খরচ—এই তিনটি বিষয়ই সাফল্যের মূল কারণ বলে জানিয়েছেন কৃষক ও সংশ্লিষ্টরা। নদী অববাহিকা সংলগ্ন এলাকায় ব্যাপক চাষাবাদের ফলে সরিষা চাষে কৃষকদের আগ্রহ দিন দিন বাড়ছে।
স্থানীয় কৃষকরা জানান, আমন ধান কাটার পর জমি ফেলে না রেখে তারা সরিষা আবাদ করেন। এরপর আবার ধান রোপণ করা হয়। ফলে একই জমিতে বছরে তিনবার ফসল উৎপাদন সম্ভব হচ্ছে। এতে খরচ কমে আসছে এবং লাভ বাড়ছে। সরিষা চাষে সেচের প্রয়োজন না হওয়ায় ও কম সময়ে ফসল ওঠায় এটি কৃষকদের কাছে আরও লাভজনক হয়ে উঠেছে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, জেলায় এ বছর মোট ১ হাজার ৯৯৫ হেক্টর জমিতে সরিষার আবাদ হয়েছে। এর মধ্যে সদর উপজেলায় ৬০ হেক্টর, রায়পুরে ৭২৫ হেক্টর, রামগঞ্জে ৫৫ হেক্টর, কমলনগরে ৪৫ হেক্টর এবং রামগতিতে ৬২ হেক্টর জমিতে সরিষা চাষ হয়েছে। চলতি মৌসুমে উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ১ হাজার ৮৯০ মেট্রিক টন।
সরিষার তেলের রয়েছে নানা ওষুধি গুণ। সরিষার খৈল পশুখাদ্য হিসেবে ব্যবহারের পাশাপাশি জমির উর্বরতা বৃদ্ধি করে। সরিষার গাছ জ্বালানি হিসেবেও কাজে আসে। জমিতে সরিষা আবাদ করলে পাতা ঝরে জমির পুষ্টি চাহিদাও অনেকাংশে পূরণ হয়।
লক্ষ্মীপুর সদর উপজেলার সরিষা চাষি মোহাম্মদ বেলাল হোসেন ও ইমাম হোসেন জানান, প্রতি বিঘা জমিতে সরিষা চাষে সর্বোচ্চ খরচ হয় প্রায় ৪ হাজার টাকা। প্রতি মণ সরিষা ৪ হাজার থেকে ৪ হাজার ৫০০ টাকা দরে বিক্রি করা যায়। গড়ে প্রতি বিঘায় ৬ থেকে ৭ মণ সরিষা উৎপাদন হলে ২০ থেকে ২৫ হাজার টাকা পর্যন্ত লাভ করা সম্ভব। তবে কীটনাশক ও সারের দাম বৃদ্ধিতে কিছুটা ভোগান্তির কথা জানান তারা।
লক্ষ্মীপুর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপসহকারী পরিচালক সালাহ উদ্দিন বলেন, “জেলায় প্রায় ১ হাজার ৮০৫ হেক্টর জমিতে সরিষার আবাদ হয়েছে। আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় এবার বাম্পার ফলনের আশা করছি। কৃষকদের প্রয়োজনীয় বীজ ও সার সহায়তা দেওয়া হয়েছে। বাজারে সয়াবিন তেলের দাম বেশি থাকায় সরিষার দামও ভালো থাকবে বলে ধারণা করছি।”
সব মিলিয়ে সরিষার হলুদ ফুলে মোড়া লক্ষ্মীপুরের মাঠ শুধু নয়নাভিরাম দৃশ্যই নয়, কৃষকের অর্থনৈতিক স্বচ্ছলতার বার্তাও বহন করছে।

জনপ্রিয় সংবাদ

পুরুষ নির্যাতন প্রতিরোধে আইন প্রণয়নের নির্দেশনা চেয়ে হাইকোর্টে রিট

হলুদে মোড়া লক্ষ্মীপুরের মাঠ, সরিষার বাম্পার ফলনে বদলাচ্ছে গ্রামীণ অর্থনীতি।

আপডেট টাইম : ০৫:৪৩:২৫ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ১৭ জানুয়ারী ২০২৬

মাহমুদুর রহমান মনজু, লক্ষ্মীপুর প্রতিনিধি:
দিগন্তজোড়া মাঠজুড়ে সরিষার হলুদ ফুলে রঙিন হয়ে উঠেছে লক্ষ্মীপুরের কৃষি প্রান্তর। সরিষার বাম্পার ফলন এবার কৃষকের স্বপ্নকে আরও দৃঢ় করেছে, একই সঙ্গে গ্রামীণ অর্থনীতিতে জেগে উঠেছে সম্ভাবনার হাতছানি। চলতি মৌসুমে লক্ষ্মীপুর জেলার রায়পুর উপজেলায় প্রায় ১০ দশমিক ৩০ টন সরিষা উৎপাদনের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় বিস্তীর্ণ মাঠে এখন হলুদের ঢেউ।
সরেজমিনে দেখা যায়, রায়পুরসহ সদর, রামগঞ্জ, রামগতি ও কমলনগর উপজেলার মাঠগুলো সরিষা ফুলের হলুদ আভায় অপরূপ সৌন্দর্য ধারণ করেছে। ধূ-ধূ চর থেকে উঁচু জমি—সবখানেই যেন কেউ হলুদ চাদর বিছিয়ে রেখেছে। গাঢ় হলুদ ফুলে মৌমাছির গুনগুন শব্দ, শীতের শিশিরে ভেজা সরিষা ফুলের ঘ্রাণ বাতাসে ভেসে বেড়াচ্ছে, যা পথচারী ও দর্শনার্থীদের মন ছুঁয়ে যাচ্ছে।
লক্ষ্মীপুরে বিশেষ করে রায়পুর ও রামগতি এলাকায় সরিষা চাষে এবার বাম্পার ফলন হয়েছে। অনুকূল আবহাওয়া, কৃষি বিভাগের সহায়তা (উন্নত বীজ ও সার) এবং তুলনামূলক কম উৎপাদন খরচ—এই তিনটি বিষয়ই সাফল্যের মূল কারণ বলে জানিয়েছেন কৃষক ও সংশ্লিষ্টরা। নদী অববাহিকা সংলগ্ন এলাকায় ব্যাপক চাষাবাদের ফলে সরিষা চাষে কৃষকদের আগ্রহ দিন দিন বাড়ছে।
স্থানীয় কৃষকরা জানান, আমন ধান কাটার পর জমি ফেলে না রেখে তারা সরিষা আবাদ করেন। এরপর আবার ধান রোপণ করা হয়। ফলে একই জমিতে বছরে তিনবার ফসল উৎপাদন সম্ভব হচ্ছে। এতে খরচ কমে আসছে এবং লাভ বাড়ছে। সরিষা চাষে সেচের প্রয়োজন না হওয়ায় ও কম সময়ে ফসল ওঠায় এটি কৃষকদের কাছে আরও লাভজনক হয়ে উঠেছে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, জেলায় এ বছর মোট ১ হাজার ৯৯৫ হেক্টর জমিতে সরিষার আবাদ হয়েছে। এর মধ্যে সদর উপজেলায় ৬০ হেক্টর, রায়পুরে ৭২৫ হেক্টর, রামগঞ্জে ৫৫ হেক্টর, কমলনগরে ৪৫ হেক্টর এবং রামগতিতে ৬২ হেক্টর জমিতে সরিষা চাষ হয়েছে। চলতি মৌসুমে উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ১ হাজার ৮৯০ মেট্রিক টন।
সরিষার তেলের রয়েছে নানা ওষুধি গুণ। সরিষার খৈল পশুখাদ্য হিসেবে ব্যবহারের পাশাপাশি জমির উর্বরতা বৃদ্ধি করে। সরিষার গাছ জ্বালানি হিসেবেও কাজে আসে। জমিতে সরিষা আবাদ করলে পাতা ঝরে জমির পুষ্টি চাহিদাও অনেকাংশে পূরণ হয়।
লক্ষ্মীপুর সদর উপজেলার সরিষা চাষি মোহাম্মদ বেলাল হোসেন ও ইমাম হোসেন জানান, প্রতি বিঘা জমিতে সরিষা চাষে সর্বোচ্চ খরচ হয় প্রায় ৪ হাজার টাকা। প্রতি মণ সরিষা ৪ হাজার থেকে ৪ হাজার ৫০০ টাকা দরে বিক্রি করা যায়। গড়ে প্রতি বিঘায় ৬ থেকে ৭ মণ সরিষা উৎপাদন হলে ২০ থেকে ২৫ হাজার টাকা পর্যন্ত লাভ করা সম্ভব। তবে কীটনাশক ও সারের দাম বৃদ্ধিতে কিছুটা ভোগান্তির কথা জানান তারা।
লক্ষ্মীপুর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপসহকারী পরিচালক সালাহ উদ্দিন বলেন, “জেলায় প্রায় ১ হাজার ৮০৫ হেক্টর জমিতে সরিষার আবাদ হয়েছে। আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় এবার বাম্পার ফলনের আশা করছি। কৃষকদের প্রয়োজনীয় বীজ ও সার সহায়তা দেওয়া হয়েছে। বাজারে সয়াবিন তেলের দাম বেশি থাকায় সরিষার দামও ভালো থাকবে বলে ধারণা করছি।”
সব মিলিয়ে সরিষার হলুদ ফুলে মোড়া লক্ষ্মীপুরের মাঠ শুধু নয়নাভিরাম দৃশ্যই নয়, কৃষকের অর্থনৈতিক স্বচ্ছলতার বার্তাও বহন করছে।