০৪:০৩ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ২১ ফেব্রুয়ারী ২০২৬, ৮ ফাল্গুন ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

দিল্লির শাহী জামে মসজিদের আদলে নির্মিত জ্বীনের মসজিদ

লক্ষ্মীপুরের রায়পুরে অবস্থিত প্রাচীন জ্বীনের মসজিদ ইতিহাস, রহস্য ও আধ্যাত্মিকতার এক অনন্য নিদর্শন। দিল্লির ঐতিহাসিক শাহী জামে মসজিদের আদলে নির্মিত এই মসজিদটি প্রায় দুই শতাব্দী ধরে এলাকার ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।

প্রায় ২০০ বছর আগে মেঘনা ও খরস্রোতা ডাকাতিয়া নদীর মোহনা সংলগ্ন রায়পুর উপজেলা ছিল জনবিরল চরাঞ্চল। বিভিন্ন দেশ থেকে আগত ধর্ম সাধকদের আগমনে এ অঞ্চল ইসলামের প্রচার-প্রসারের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে পরিচিতি পায়।

বাংলা ১২৩৫ সাল (ইংরেজি ১৮২৮) নাগাদ রায়পুরের এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন ধর্মপ্রাণ আলেম মাওলানা আবদুল্লাহ। প্রাথমিক শিক্ষা শেষে উচ্চতর দ্বীনি শিক্ষার জন্য তিনি ভারতে গমন করেন এবং দীর্ঘদিন আলেমদের সান্নিধ্যে থেকে জ্ঞান অর্জন করেন।

দেশে ফেরার পথে দিল্লিতে অবস্থানকালে শাহী জামে মসজিদের স্থাপত্য তাকে গভীরভাবে অনুপ্রাণিত করে। পরে নিজ এলাকায় একই আদলে একটি মসজিদ নির্মাণের উদ্যোগ নেন। এলাকাবাসীর মতে, ১৮৮৮ সালে তিন গম্বুজবিশিষ্ট ১১০ ফুট দৈর্ঘ্য ও ৭০ ফুট প্রস্থের এই মসজিদটি প্রতিষ্ঠিত হয়।

লোকমুখে প্রচলিত আছে রাতের আঁধারে জ্বীন শিষ্যরা নির্মাণকাজে সহায়তা করেছিল। সেখান থেকেই “জ্বীনের মসজিদ” নামের প্রচলন। মসজিদটির বিশেষ বৈশিষ্ট্য হলো উঁচু ভিটির ওপর নির্মাণ। ভূমি থেকে প্রায় ১৫ ফুট উঁচু প্ল্যাটফর্মে দাঁড়িয়ে থাকা এই মসজিদে উঠতে হয় ১৩ ধাপ সিঁড়ি বেয়ে। দেয়ালের পুরুত্ব প্রায় ৮ ফুট। মসজিদের নিচে প্রায় ২০ ফুট গভীরে তিন কক্ষবিশিষ্ট একটি গোপন ইবাদতখানাও রয়েছে, যেখানে নির্জনে ইবাদত করতেন মাওলানা আবদুল্লাহ। সামনে রয়েছে প্রায় ২৫ ফুট উচ্চতার একটি পুরোনো মিনার।

রায়পুর পৌর শহর থেকে অল্প দূরত্বে পীর ফয়েজ উল্লাহ সড়কের দক্ষিণ পাশে অবস্থিত এই স্থাপনাটি স্থানীয়ভাবে “মৌলভী আবদুল্লাহ সাহেবের মসজিদ” নামেও পরিচিত। শিলালিপি অনুযায়ী এর প্রকৃত নাম “মসজিদ-ই-জামে আবদুল্লাহ”।

স্থানীয় বাসিন্দা মিজানুর রহমান বলেন, এটি আমাদের এলাকার অন্যতম প্রাচীন ও ঐতিহাসিক স্থাপনা। যথাযথ সংরক্ষণ না থাকায় ধীরে ধীরে মসজিদটির সৌন্দর্য নষ্ট হচ্ছে। সরকার ও বিত্তবানদের সহযোগিতা পেলে এটি বড় পর্যটনকেন্দ্র হতে পারে।

অন্য স্থানীয় বাসিন্দা মামুনুর রশীদ বলেন, দেশের বিভিন্ন জায়গা থেকে মানুষ এই মসজিদ দেখতে আসে। কিন্তু পর্যাপ্ত সংস্কার ও রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে দর্শনার্থীরা কাঙ্ক্ষিত পরিবেশ পান না। দ্রুত সংস্কার জরুরি।

মসজিদের ইমাম মাওলানা লুৎফর রহমান বলেন, মসজিদের মূল নকশা অনুযায়ী এখনও কিছু কাজ অসম্পূর্ণ রয়েছে। দান-অনুদান ও সরকারি সহযোগিতা পেলে মসজিদের পূর্ণ সৌন্দর্য ফিরে আসবে এবং এটি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য সংরক্ষণ করা সম্ভব হবে।

প্রায় দুই শতাব্দী ধরে ইতিহাস, রহস্য ও আধ্যাত্মিকতার সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা রায়পুরের জ্বীনের মসজিদ আজ সংরক্ষণ ও সংস্কারের অপেক্ষায়। দ্রুত উদ্যোগ নেওয়া হলে এটি শুধু ধর্মীয় স্থাপনা নয়, দেশের গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক ও পর্যটনকেন্দ্র হিসেবেও গড়ে উঠতে পারে।

জনপ্রিয় সংবাদ

সড়কে চাঁদাবাজির সুযোগ নেই: পানিসম্পদ মন্ত্রী

দিল্লির শাহী জামে মসজিদের আদলে নির্মিত জ্বীনের মসজিদ

আপডেট টাইম : ০১:২৮:১৪ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৯ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

লক্ষ্মীপুরের রায়পুরে অবস্থিত প্রাচীন জ্বীনের মসজিদ ইতিহাস, রহস্য ও আধ্যাত্মিকতার এক অনন্য নিদর্শন। দিল্লির ঐতিহাসিক শাহী জামে মসজিদের আদলে নির্মিত এই মসজিদটি প্রায় দুই শতাব্দী ধরে এলাকার ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।

প্রায় ২০০ বছর আগে মেঘনা ও খরস্রোতা ডাকাতিয়া নদীর মোহনা সংলগ্ন রায়পুর উপজেলা ছিল জনবিরল চরাঞ্চল। বিভিন্ন দেশ থেকে আগত ধর্ম সাধকদের আগমনে এ অঞ্চল ইসলামের প্রচার-প্রসারের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে পরিচিতি পায়।

বাংলা ১২৩৫ সাল (ইংরেজি ১৮২৮) নাগাদ রায়পুরের এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন ধর্মপ্রাণ আলেম মাওলানা আবদুল্লাহ। প্রাথমিক শিক্ষা শেষে উচ্চতর দ্বীনি শিক্ষার জন্য তিনি ভারতে গমন করেন এবং দীর্ঘদিন আলেমদের সান্নিধ্যে থেকে জ্ঞান অর্জন করেন।

দেশে ফেরার পথে দিল্লিতে অবস্থানকালে শাহী জামে মসজিদের স্থাপত্য তাকে গভীরভাবে অনুপ্রাণিত করে। পরে নিজ এলাকায় একই আদলে একটি মসজিদ নির্মাণের উদ্যোগ নেন। এলাকাবাসীর মতে, ১৮৮৮ সালে তিন গম্বুজবিশিষ্ট ১১০ ফুট দৈর্ঘ্য ও ৭০ ফুট প্রস্থের এই মসজিদটি প্রতিষ্ঠিত হয়।

লোকমুখে প্রচলিত আছে রাতের আঁধারে জ্বীন শিষ্যরা নির্মাণকাজে সহায়তা করেছিল। সেখান থেকেই “জ্বীনের মসজিদ” নামের প্রচলন। মসজিদটির বিশেষ বৈশিষ্ট্য হলো উঁচু ভিটির ওপর নির্মাণ। ভূমি থেকে প্রায় ১৫ ফুট উঁচু প্ল্যাটফর্মে দাঁড়িয়ে থাকা এই মসজিদে উঠতে হয় ১৩ ধাপ সিঁড়ি বেয়ে। দেয়ালের পুরুত্ব প্রায় ৮ ফুট। মসজিদের নিচে প্রায় ২০ ফুট গভীরে তিন কক্ষবিশিষ্ট একটি গোপন ইবাদতখানাও রয়েছে, যেখানে নির্জনে ইবাদত করতেন মাওলানা আবদুল্লাহ। সামনে রয়েছে প্রায় ২৫ ফুট উচ্চতার একটি পুরোনো মিনার।

রায়পুর পৌর শহর থেকে অল্প দূরত্বে পীর ফয়েজ উল্লাহ সড়কের দক্ষিণ পাশে অবস্থিত এই স্থাপনাটি স্থানীয়ভাবে “মৌলভী আবদুল্লাহ সাহেবের মসজিদ” নামেও পরিচিত। শিলালিপি অনুযায়ী এর প্রকৃত নাম “মসজিদ-ই-জামে আবদুল্লাহ”।

স্থানীয় বাসিন্দা মিজানুর রহমান বলেন, এটি আমাদের এলাকার অন্যতম প্রাচীন ও ঐতিহাসিক স্থাপনা। যথাযথ সংরক্ষণ না থাকায় ধীরে ধীরে মসজিদটির সৌন্দর্য নষ্ট হচ্ছে। সরকার ও বিত্তবানদের সহযোগিতা পেলে এটি বড় পর্যটনকেন্দ্র হতে পারে।

অন্য স্থানীয় বাসিন্দা মামুনুর রশীদ বলেন, দেশের বিভিন্ন জায়গা থেকে মানুষ এই মসজিদ দেখতে আসে। কিন্তু পর্যাপ্ত সংস্কার ও রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে দর্শনার্থীরা কাঙ্ক্ষিত পরিবেশ পান না। দ্রুত সংস্কার জরুরি।

মসজিদের ইমাম মাওলানা লুৎফর রহমান বলেন, মসজিদের মূল নকশা অনুযায়ী এখনও কিছু কাজ অসম্পূর্ণ রয়েছে। দান-অনুদান ও সরকারি সহযোগিতা পেলে মসজিদের পূর্ণ সৌন্দর্য ফিরে আসবে এবং এটি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য সংরক্ষণ করা সম্ভব হবে।

প্রায় দুই শতাব্দী ধরে ইতিহাস, রহস্য ও আধ্যাত্মিকতার সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা রায়পুরের জ্বীনের মসজিদ আজ সংরক্ষণ ও সংস্কারের অপেক্ষায়। দ্রুত উদ্যোগ নেওয়া হলে এটি শুধু ধর্মীয় স্থাপনা নয়, দেশের গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক ও পর্যটনকেন্দ্র হিসেবেও গড়ে উঠতে পারে।