০৬:৫১ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ২২ জুলাই ২০২৬, ৭ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

খননের অভাবে নাব্য হারিয়েছে আলীয়াবাদ খাল, দুর্ভোগে জনপদ

দখল ও দীর্ঘদিন খনন না হওয়ায় ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নবীনগর উপজেলার ঐতিহ্যবাহী আলীয়াবাদ বিলের খাল এখন প্রায় ড্রেইনে পরিণত হয়েছে। পানি চলাচল বন্ধ হয়ে যাওয়ায় সামান্য বৃষ্টিতেই বিলজুড়ে সৃষ্টি হচ্ছে জলাবদ্ধতা। এতে তলিয়ে যাচ্ছে ইরি-বোরো ধানের ফসলি জমি। আবার শুকনো মৌসুমে খালে পানি না থাকায় সেচ সংকটে দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে শত শত কৃষককে।

উপজেলার শ্রীরামপুর মৌজার ২৪৫ দাগের ১ নম্বর খাস খতিয়ানভুক্ত খালটি জেলা এলএ শাখায় ‘কুট্টাপাড়া ফিসারি জলমহল’ নামে পরিচিত। সরকারি ম্যাপে খালটির দৈর্ঘ্য প্রায় ২ হাজার ৪০০ ফুট এবং প্রস্থ ৬০ থেকে ১০০ ফুট উল্লেখ থাকলেও বর্তমানে সরেজমিনে দেখা গেছে, এটি মাত্র তিন থেকে চার ফুট প্রশস্ত সরু ড্রেইনের মতো হয়ে গেছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, বুড়ি নদী থেকে উৎপত্তি হয়ে মাঝিকাড়া ও আলীয়াবাদ গ্রামের উত্তর পাশ দিয়ে প্রবাহিত হয়ে খালটি ভাটা নদীতে গিয়ে মিলিত হয়েছে। ১৯৭৯ সালে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান এ খালের পাড় দিয়ে হেঁটে ভাটা নদী খনন কাজের উদ্বোধন করেছিলেন। সে সময় তিনি কিছুক্ষণ খালের পাড়ে বিশ্রামও নিয়েছিলেন বলে জানান এলাকাবাসী।
স্থানীয় সার্ভেয়ারদের মাধ্যমে পরিমাপে দেখা যায়, শত বছরের পুরোনো এই খালের কোথাও কোথাও প্রস্থ ছিল ১০০ ফুট পর্যন্ত। তবে কয়েক যুগ ধরে পুনঃখনন না হওয়ায় প্রভাবশালীরা খালের পাড় কেটে ভরাট করে জমির সঙ্গে একাকার করে ফেলেছেন। ফলে খালটি তার স্বাভাবিক অস্তিত্ব হারিয়েছে।
স্থানীয়রা জানান, খালে পানি চলাচল বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বর্ষাকালে বিলের পানি দূষিত হয়ে পড়ে। জমে থাকে কচুরিপানা। পানিতে নামলেই চুলকানিসহ বিভিন্ন রোগব্যাধি দেখা দেয়। মারা যাচ্ছে মাছ ও জলজ প্রাণী।
স্থানীয় জেলেদের ভাষ্য, একসময় বর্ষা ও শুকনো—দুই মৌসুমেই খালটিতে প্রচুর মাছ পাওয়া যেত। মাছ বিক্রি করেই চলত অনেক পরিবারের জীবিকা। কিন্তু খালটি প্রায় বিলুপ্ত হয়ে যাওয়ায় এখন তাদের সংসার চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে।
আলীয়াবাদ গ্রামের বাসিন্দা বীর মুক্তিযোদ্ধা আবদুল মান্নান বলেন, “আমার বাবা সারা বছর এই খাল থেকে মাছ ধরতেন। ছোটবেলায় আমরাও সাঁতার কাটতাম, মাছ ধরতাম। বর্ষাকালে পাল তোলা নৌকা চলত, মাঝিদের গান শোনা যেত। এখন দেখে বোঝার উপায় নেই এখানে একসময় খরস্রোতা খাল ছিল।”
একই গ্রামের প্রবীণ বাসিন্দা জহিরুল হক সর্দার বলেন, “আলীয়াবাদ, মাঝিকাড়া ও নবীনগর শহরের বৃষ্টির পানি নিষ্কাশনের অন্যতম মাধ্যম ছিল এই খাল। স্বাধীনতার আগে একবার খনন করা হয়েছিল। এরপর আর তেমন সংস্কার হয়নি। সুযোগে অনেকে খালের জায়গা ভরাট করে দখল করে নিয়েছে।”
স্থানীয় বাসিন্দা ইউনুস আলী, ইকবাল হোসেন বসু ও হুমায়ুন কবির জানান, চলতি মাসের কালবৈশাখী ঝড় ও টানা বৃষ্টিতে খাল দিয়ে পানি নামতে না পারায় অসংখ্য বিঘা জমির পাকা ধান পানির নিচে তলিয়ে গেছে। তারা বলেন, “শুকনো মৌসুমে এই খালই ছিল সেচের প্রধান উৎস। এখন খাল ভরাট হয়ে যাওয়ায় অনেক জমি অনাবাদি পড়ে থাকে। আবার সামান্য বৃষ্টিতেই ফসল ডুবে যায়।”
তাদের অভিযোগ, বৃষ্টির পানির সঙ্গে বাড়িঘর ও নর্দমার ময়লা জমিতে ঢুকে ফসল নষ্ট করছে। তাই দ্রুত খালের সীমানা নির্ধারণ করে পুনঃখননের মাধ্যমে পানি নিষ্কাশন ও সেচ ব্যবস্থার উপযোগী করার দাবি জানান তারা।
এ বিষয়ে নবীনগর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. মাহমুদুল হাসান বলেন, “আলীয়াবাদ বিলের খাল দখল ও ভরাট হওয়ার বিষয়টি এই প্রথম জানলাম। খোঁজখবর নিয়ে এমপি মহোদয়ের সঙ্গে আলোচনা করে খালটি চলমান খাল খনন কর্মসূচিতে অন্তর্ভুক্ত করার বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
নবীনগর উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) খালিদ বিন মনসুর বলেন, “খালের জায়গা লিজ দেওয়ার কোনো বিধান নেই। কেউ লিজ নেওয়ার দাবি করলে তাকে প্রমাণপত্র নিয়ে আসতে হবে। তখন বিষয়টি যাচাই করা হবে।

জনপ্রিয় সংবাদ

পুরুষ নির্যাতন প্রতিরোধে আইন প্রণয়নের নির্দেশনা চেয়ে হাইকোর্টে রিট

খননের অভাবে নাব্য হারিয়েছে আলীয়াবাদ খাল, দুর্ভোগে জনপদ

আপডেট টাইম : ১০:১২:২২ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৪ মে ২০২৬

দখল ও দীর্ঘদিন খনন না হওয়ায় ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নবীনগর উপজেলার ঐতিহ্যবাহী আলীয়াবাদ বিলের খাল এখন প্রায় ড্রেইনে পরিণত হয়েছে। পানি চলাচল বন্ধ হয়ে যাওয়ায় সামান্য বৃষ্টিতেই বিলজুড়ে সৃষ্টি হচ্ছে জলাবদ্ধতা। এতে তলিয়ে যাচ্ছে ইরি-বোরো ধানের ফসলি জমি। আবার শুকনো মৌসুমে খালে পানি না থাকায় সেচ সংকটে দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে শত শত কৃষককে।

উপজেলার শ্রীরামপুর মৌজার ২৪৫ দাগের ১ নম্বর খাস খতিয়ানভুক্ত খালটি জেলা এলএ শাখায় ‘কুট্টাপাড়া ফিসারি জলমহল’ নামে পরিচিত। সরকারি ম্যাপে খালটির দৈর্ঘ্য প্রায় ২ হাজার ৪০০ ফুট এবং প্রস্থ ৬০ থেকে ১০০ ফুট উল্লেখ থাকলেও বর্তমানে সরেজমিনে দেখা গেছে, এটি মাত্র তিন থেকে চার ফুট প্রশস্ত সরু ড্রেইনের মতো হয়ে গেছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, বুড়ি নদী থেকে উৎপত্তি হয়ে মাঝিকাড়া ও আলীয়াবাদ গ্রামের উত্তর পাশ দিয়ে প্রবাহিত হয়ে খালটি ভাটা নদীতে গিয়ে মিলিত হয়েছে। ১৯৭৯ সালে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান এ খালের পাড় দিয়ে হেঁটে ভাটা নদী খনন কাজের উদ্বোধন করেছিলেন। সে সময় তিনি কিছুক্ষণ খালের পাড়ে বিশ্রামও নিয়েছিলেন বলে জানান এলাকাবাসী।
স্থানীয় সার্ভেয়ারদের মাধ্যমে পরিমাপে দেখা যায়, শত বছরের পুরোনো এই খালের কোথাও কোথাও প্রস্থ ছিল ১০০ ফুট পর্যন্ত। তবে কয়েক যুগ ধরে পুনঃখনন না হওয়ায় প্রভাবশালীরা খালের পাড় কেটে ভরাট করে জমির সঙ্গে একাকার করে ফেলেছেন। ফলে খালটি তার স্বাভাবিক অস্তিত্ব হারিয়েছে।
স্থানীয়রা জানান, খালে পানি চলাচল বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বর্ষাকালে বিলের পানি দূষিত হয়ে পড়ে। জমে থাকে কচুরিপানা। পানিতে নামলেই চুলকানিসহ বিভিন্ন রোগব্যাধি দেখা দেয়। মারা যাচ্ছে মাছ ও জলজ প্রাণী।
স্থানীয় জেলেদের ভাষ্য, একসময় বর্ষা ও শুকনো—দুই মৌসুমেই খালটিতে প্রচুর মাছ পাওয়া যেত। মাছ বিক্রি করেই চলত অনেক পরিবারের জীবিকা। কিন্তু খালটি প্রায় বিলুপ্ত হয়ে যাওয়ায় এখন তাদের সংসার চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে।
আলীয়াবাদ গ্রামের বাসিন্দা বীর মুক্তিযোদ্ধা আবদুল মান্নান বলেন, “আমার বাবা সারা বছর এই খাল থেকে মাছ ধরতেন। ছোটবেলায় আমরাও সাঁতার কাটতাম, মাছ ধরতাম। বর্ষাকালে পাল তোলা নৌকা চলত, মাঝিদের গান শোনা যেত। এখন দেখে বোঝার উপায় নেই এখানে একসময় খরস্রোতা খাল ছিল।”
একই গ্রামের প্রবীণ বাসিন্দা জহিরুল হক সর্দার বলেন, “আলীয়াবাদ, মাঝিকাড়া ও নবীনগর শহরের বৃষ্টির পানি নিষ্কাশনের অন্যতম মাধ্যম ছিল এই খাল। স্বাধীনতার আগে একবার খনন করা হয়েছিল। এরপর আর তেমন সংস্কার হয়নি। সুযোগে অনেকে খালের জায়গা ভরাট করে দখল করে নিয়েছে।”
স্থানীয় বাসিন্দা ইউনুস আলী, ইকবাল হোসেন বসু ও হুমায়ুন কবির জানান, চলতি মাসের কালবৈশাখী ঝড় ও টানা বৃষ্টিতে খাল দিয়ে পানি নামতে না পারায় অসংখ্য বিঘা জমির পাকা ধান পানির নিচে তলিয়ে গেছে। তারা বলেন, “শুকনো মৌসুমে এই খালই ছিল সেচের প্রধান উৎস। এখন খাল ভরাট হয়ে যাওয়ায় অনেক জমি অনাবাদি পড়ে থাকে। আবার সামান্য বৃষ্টিতেই ফসল ডুবে যায়।”
তাদের অভিযোগ, বৃষ্টির পানির সঙ্গে বাড়িঘর ও নর্দমার ময়লা জমিতে ঢুকে ফসল নষ্ট করছে। তাই দ্রুত খালের সীমানা নির্ধারণ করে পুনঃখননের মাধ্যমে পানি নিষ্কাশন ও সেচ ব্যবস্থার উপযোগী করার দাবি জানান তারা।
এ বিষয়ে নবীনগর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. মাহমুদুল হাসান বলেন, “আলীয়াবাদ বিলের খাল দখল ও ভরাট হওয়ার বিষয়টি এই প্রথম জানলাম। খোঁজখবর নিয়ে এমপি মহোদয়ের সঙ্গে আলোচনা করে খালটি চলমান খাল খনন কর্মসূচিতে অন্তর্ভুক্ত করার বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
নবীনগর উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) খালিদ বিন মনসুর বলেন, “খালের জায়গা লিজ দেওয়ার কোনো বিধান নেই। কেউ লিজ নেওয়ার দাবি করলে তাকে প্রমাণপত্র নিয়ে আসতে হবে। তখন বিষয়টি যাচাই করা হবে।